মে’'রাজ (পর্ব- ৮) সৃষ্টির শেষ সাক্ষী



রসূলুল্লাহ (সঃ) এর মে'রাজ (পর্ব- ৮)

চতুর্থ অভ্যর্থনা সয়ং আল্লাহ্ ও ফেরেশতা কতৃক -

এটাই ছিল সৃষ্টির শেষ সাক্ষী পর্ব— মেরাজের এতটুকু পর্যন্ত ফেরেশতারা জানবে যা এ পর্বে আলোচনা করতে যাচ্ছি। রসুলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন সিদরাতুল মুনতাহায় পৌছলেন তথায় দেখতে পান,- একাধিক উজ্জ্বল রংয়ের বিশেষ বস্তুসমুহ (ফেরেশতা) ওই সিদরাতুল মুনতাহা-কে (কুল বৃক্ষকে) আচ্ছাদিত করে ফেলে৷ বৃক্ষে ছড়ানো পাখীর ঝাকের ন্যায় ফেরেশতাগণ ওই বৃক্ষে আরোহণ করে৷ কিছু কিছু দেখতে স্বর্ণের পতঙ্গের মত। স্বর্ণের পতঙ্গণ্ডলা বৃক্ষটিতে উড়াউড়ি করতে থাকে৷ [নুরের উজ্জলতা প্রকাশ করতে এখানে সর্ণের মত বলা হয়েছ] কতইনা মনোহর সেই দৃশ্য, সকল ফেরেশতা তখন সমবেত কন্ঠে আল্লাহর (যিকির) পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষনায় ব্যস্ত ছিলেন। এটা যেন আল্লাহর হাবীবের (সৃষ্টি) কে আল্লাহ'র (স্রষ্টার) অভ্যর্থনা পর্ব। সৃষ্টিকে বুঝাতে আল্লাহ্ তা'আলা কোরআনুল করিমে উল্লেখ করেন- "بِعَبۡدِهٖ"। সমস্ত সৃষ্টিই আল্লাহ্ তা'আলার জন্য  "عَبۡدِ"  (আব্দ)। কপট বিশ্বাসীরা এই আব্দ এর অর্থ হিসেবে বুঝাতে চায় আমাদের মত একজন মানুষকে মে'রাজে নিয়ে গেছেন। এই মি'রাজের থেকেই বুঝা যায় নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার শান-মান আল্লাহর কাছে কত উর্ধে। এটাই হল প্রকৃতপক্ষে বিস্ময়ের বিষয়। তা এই কারণে যে সৃষ্টির কারো কাছে (ফরেশতা,জীন,ইনসান) এই ধারণা পূর্বে ছিলনা। যার কারণে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নামের 'ছোবহান' ( سُبۡحٰنَ) দিয়ে এই ঘঠনার কথা উল্লেখ করেছেন। যদিও আমরা মনে করি 'বিস্ময়' দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার মুহূর্তে সম্পাদন করাকে। এটাই যদি বিস্ময় হত সাধারণ একজন মানুষ (যিনি নবীও নন রসূলও নন) রাণী বিলকিসের সিংহাসন মুহুর্তে নিয়ে সোলায়মান (আঃ)-এর সন্মুখে উপস্থাপন করেছিলেন সেটা আরো বড় বিস্ময়ের ব্যাপার। এবার ফিরে যাই সেই সেই বৃক্ষের দিকে।


অতঃপর আল্লাহ তাআলা-র (নুর) মুবারকের জ্যাতিতে ওই বৃক্ষ (সিদরাতুল মুনতাহা) আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে৷ সেই বৃক্ষকে বেষ্টন করে নিল আল্লাহর নুর। তখন সেই বৃক্ষের অবস্থার পরিবর্তন ঘঠে, এর পর কি রকম পরিবর্তন হয়েছিল তা হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বর্ণনা করেননি। শুধু এতটুকু বলেছিলেন সেই সৌন্দর্য অবর্ণনীয়, অর্থাত যার সৌন্দর্য বর্ণনা করার মত ভাষা হতে পারেনা। এখানে মেনেনিতে হবে হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বর্ণনা করতে পারতেন কিন্তু বুঝার সাধ্য কারো ছিলনা। নাহয় হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বর্ণনা করতে পারবেননা এমন হতেই পারেনা। যাদের অন্তরচক্ষু তীক্ষ শুধু তারাই সেই সৌন্দর্য দেখিতে ও উপলব্দি করিতে পারিবেন। কারণ সামনে উপস্থাপন করিলেও তা মানবচোখে দেখার সক্ষমতা নেই কল্পনাতেও আসবেনা।যেমন, এই নুরের কিঞ্চিত ঝলকে 'তুর' পাহার জ্বলে ছারকার হয়ে গিয়েছিল এবং মুসা (আঃ) দেখতে পারেননি বরং মুর্চিত হয়েছিলেন। পূর্ণ নুর দেখারতো প্রশ্নই আসেনা। বাস্তবে মে’রাজ রজনীতে এটাই রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে আল্লাহর প্রথম দর্শন ! যা ছিল নুরানী হালতে। তাইতো কোন সাহাবীর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন নুর দেখেছেন।'সুবহানাল্লাহ' ! তা ছিল 'ইরাজ' এর আগাম অভ্যর্থনা। যেমনটি হযরত মূসা (আঃ) হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে অভ্যর্তনামুলক 'সালাতে' (সালাত ও সালাম) রত ছিলেন স্বীয় কবর মুবারকে, পরে আবার বাইতুল মুকাদ্দেসে মসজিদুল আকসা শরীফেও হাজির ছিলেন। এখানে আল্লাহ্ তা’আলা নুরানী হালতে প্রকাশ পেয়ে অভ্যর্থনা করেছেন (আল্লাহই এ বিষয়ে ভাল জানেন) এই পর্যন্ত মি’রাজ ভ্রমন শেষ। এই সিদরাতুল মুনতাহার  পার্শেই আরশের নিন্মভাগ তার তলদেশে আল্লাহর অফুরন্ত ধনভান্ডার। তথা হইতে হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে আল্লাহ অনেক কিছুই দান করেছেন যার সকল কিছু তিনি প্রকাশ করেননি। যেমন- সুরা ফাতেহা,পাঁচ ওয়াক্ত নামায, সূরা বাকারার শেষাংশ (দুই আয়াত) ও তাঁহার উম্মতের যাহারা শির্ক করে নাই, তাহাদের ক্ষমার সুসংবাদ। দান করিলেন। (তপসীরে ইবনে কাসীরে অনেক সাহাবী কতৃক বর্নিত) 

রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার আলোচনা এতই উর্ধে করার ঘোষনা করলেন - 'কোন খুৎবাই আল্লাহর দরবারে কবুল হবেনা যতক্ষন আল্লাহ্ ও রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাদের সাক্ষ্য দেয়া না হবে"। এই পুরষ্কারও মিরাজে নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে আরশের নিচে থেকে দেয়া হল। যেহেতু এসব নেয়ামত আরশের নিচে থেকে দেয়া হল ! তাতে প্রতিয়মান হয়যে সপ্তাকাশে আল্লাহ্ তা'আলা সরাসরি দিয়েছেন।

এখান থেকে বুঝা গেল চুড়ান্ত পর্বের পূর্বেই এই সব নেয়ামত দেয়া হয়েছিল। যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ দান করাই প্রধান উদ্দেশ্য হত তাহলে মেরাজের ক্রিয়াকর্ম এতটুকুতেই শেষ হয়ে যেত। কারণ নামাজতো আরশের নিচের ভান্ডার থেকে ইতিমধ্যে দেয়া হয়ে গেছে।

পরবর্তী পর্বে আলোচনা হবে 'ইরাজ' প্রতীক্ষিত মূল ঘঠনা ‘দিদারে ইলাহী’ বা আল্লাহর সাক্ষাত (দর্শন) মুবারক।


পরবর্তী পর্ব

ইরাজ



Comments

Popular posts from this blog

কারামত - (আনা সাগরের পানি ছোট্ট পাত্রে চলে আসার রহস্য)

প্রকৃত সাধক তার উপযুক্ত মুরীদকেই সাজ্জাদানশীল করেন

মে’'রাজ (পর্ব- ১)