মে’'রাজ (পর্ব- ৯) ইরাজ
সিদরাতুল মুন্তাহা সংলগ্ন এলাকাজুড়ে আল্লাহর নিদর্শনাবলী পরিভ্রমন করে চতুর্থ পর্যায়ে কাঙ্খীত সেই অনুষ্ঠান যার না কোন সাক্ষী আছে না কেহ দেখেছেন। কারণ সীমান্ত অতিক্রম করার অনুমতি একমাত্র রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ব্যাতিত আর কাহাকেও দেয়া হয়নি।
তার প্রমান দেখি জিব্রাঈল (আঃ) এর আচরন দেখে। মুনতাহা (সিমান্ত) নামক স্থানের সিদরা নামক বৃক্ষের অবর্ণনীয় সেই দৃশ্য উপভোগের পর এমন এক পর্যায় এল যেখানে জিব্রীল (আঃ) হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার সঙ্গ ত্যাগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। অর্থাত- এর পর জীব্রীল (আঃ) যেতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। পরিনাম হিসাবে ব্যক্ত করলেন তাঁর ছয় শত নুরের পাখা জ্বলে ছারকার হয়ে যাবে। এক রেওয়ায়েতে আছে জিব্রাইল (আঃ) আল্লাহর ভয়ে এমন হয়েছিলেন যে, হযরত জাবের (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন- আমি মে'রাজ রজনীতে ঊর্ধ্বাকাশে হযরত জিব্রাঈলকে আল্লাহ তা'আলার ভয়ে উটের পিঠে পুরানো চাদরের মত পড়ে থাকতে দেখেছি। (এহইয়াও উলুমিদ্দিন ‘সিদক’)
এবং বাহন ‘মি'রাছ’ আর যেতে অক্ষমতা প্রকাশ করল। অতঃপর আল্লাহর বিশেষ কুদরতের আরেক ধরণের নুরের বাহনের (রফরফ) হাদিসে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর বর্ণনায় যা সবুজ বর্ণের ছিল। এক রেওয়ায়েতে আছে তা সবুজ বর্ণের বিশেষ আসন। তার মাধ্যমে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জীব্রাঈল (আঃ)-এর সঙ্গ ত্যাগ করে সিদরাতুল মুনতাহা থেকে আল্লাহর আহ্ববানে সাড়া দিলেন। তখন হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার অন্তরে একটু সংশয় সৃষ্টি হল (তা হয়ত এ জন্য যে তিনি স্বশরীরে সফরে আছেন তা বুঝাবার জন্য)। তখন আল্লাহ্ তা’আলা নবীজির (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তিনি একান্ত সহচর (সাহাবী) আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহুর কন্ঠে অদৃশ্য থেকে উৎসাহ দিতে লাগলেন। “ইয়া রসূলুল্লাহ্ ! আল্লাহ্ তা’আলা আপনার প্রতি সালাতে অর্থাত (প্রসংশায়) মশগুল (ব্যাস্ত)” যেমনটি কুরআন পাকে আল্লাহ তা’আলা বলেন “আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদের নিয়ে নবীর উপর সালাত আদায় করেন” এখান থেকে বুঝা গেল আল্লাহর সালাত মানে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষন করা। আবুবকরের (রঃ) আওয়াজ শুনে তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) স্বস্তি পেলেন। এখানে বুঝা যায় তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন তখন জাগ্রত এবং স্বজ্ঞানে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন - "দৃষ্টি ভ্রমও ঘটেনি" (সুরা নজম : ১৭) জাগ্রত থাকলেইতো দৃষ্টির কথা আসে।
তখন আবুবকরের কন্ঠে আহ্বানে চলতে চলতে উপরে সর্বোচ্ছে দেখতে পেলেন আল্লাহকে আপন সুরতে (আকৃতিতে) যদিও আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আক্বীদা মতে আল্লাহর কোন আকৃতি নেই, কারণ আমাদের চোখে দেখা সম্ভব নয়, যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,- "দৃষ্টিসমূহ তাঁকে (আল্লাহ্-কে) আয়ত্ব করতে পারে না" (সূরা মুবারক- আল-আন'আম /১০৩) তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে এখানে আকৃতি কোথা থেকে এল? এটা শুধু এজন্য বলা হয়ে থাকে যে, আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, দেখুন আল্ কুরআনে - "সহজাত শক্তি সম্পন্ন সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেলো, ঊর্ধ্ব দিগন্তে”। (সূরা আন্-নাজম : আয়াত ৬-৭)।[তফসীরে মাযহারী]
সহজাত শক্তির মালিক একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা। কারণ অন্য কিছুর নিজস্ব শক্তি নেই সমস্ত শক্তির মূল আল্লাহ্। বেশ কিছু সংখ্যাক তফসীরে এই স্থানে জিবরীল (আঃ) এর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কিন্তু অনেক ওলামায়েকেরাম আল্লাহর দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। এখানে আল্লাহর আকৃতি বলতে আমার লিখার উদ্দেশ্য এই নয় যে আল্লাহ নিরাকার তার বিপরীতে দলিল পেশ করা। এখানে শুধু উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই ঘঠনা মুনতাহা (সীমান্ত) পরবর্তী ঘঠনা। যেখানে আল্লাহ্ একমাত্র উনার হাবীব ছারা দ্বিতীয় কাহাকেও গমনের অনুমতি দেননি, তা বুঝানো। মানে জিব্রীল বলার সুযোগ নেই। জীব্রীল (আঃ) এর অবস্থাতো ইতিপূর্বে আলোচনা শেষ করে বিদায় নেওয়া হয়েছে। রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর একটি হাদিসে তিনি ইরশাদ মুবারক করেন “কোন বিষয়ে সন্দেহ হলে তোমরা তা প্রথ্যখ্যান কর,” হাদিসটি ইমাম আহমদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। এতে বলা হয়েছে, রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ মুবারক করেন, "মুফতি ফতোয়া দিলেও নিশ্চিতির জন্য তুমি ফতোয়া নিও হৃদয়ের কাছে"। এই হাদিসটি পাই [তফসীরে মাযহারী]-তে। আল্লাহর আকৃতি বলতে আমরা শুধু এতটুকু বুঝেনেব আল্লাহর উপস্থিতি। এখানে আকৃতি উল্লেখ করা হয়েছে শুধু আমাদের সীমিত জ্ঞানে বুঝবার জন্য।
আল্লাহ্ ছোবহানাহু তা'আলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে তাঁরই বিশেষ কুদরতে (রফরফ নামক বাহনের মাধ্যমে) কাছে নিয়ে গেলেন। যা পরবর্তীতে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, তখন আল্লাহ্-কে দেখতে পেলেন সর্বোচ্চে একটি জ্যাতিময় আলোকপিন্ডের ন্যায়, এখানে বলে রাখা উচিৎ আল্লাহ্ ছোবহানাহু তা'আলা আলোক পিন্ডের মত নন, যেমন মূসা আলাইহিস্সালাম আল্লাহকে তুর পাহাড়ে আগুনের মত দেখেছিলেন। যার প্রমান পবিত্র কুরআন পাকে আল্লাহ বলেন, -
"তিনি যখন আগুন দেখলেন, তখন পরিবারবর্গকে বললেনঃ তোমরা এখানে অবস্থান কর আমি আগুন দেখেছি। সম্ভবতঃ আমি তা থেকে তোমাদের কাছে কিছু আগুন জালিয়ে আনতে পারব অথবা আগুনে পৌছে পথের সন্ধান পাব। অতঃপর যখন তিনি আগুনের কাছে পৌছলেন, তখন আওয়াজ আসল 'হে মূসা ! আমিই তোমার পালনকর্তা, অতএব তুমি জুতা খুলে ফেল, তুমি পবিত্র উপত্যকা তুয়ায় রয়েছ"। (সুরা ত্বাহা ১০-১২) [এখানে শিক্ষনীয় বিষয় যে কোন পবিত্র স্থানে জুতা খুলে প্রবেশ করা উত্তম আদব]
সুরা আল্ নজম-এর ৬-৭ নং আয়াতের তফসীরে অনেক তফসীর কারী আল্লাহর স্থলে জিব্রিল (আঃ)-এর কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তা সঙ্গত নয় কারন হযরত আনাস (রঃ) হাসান (রঃ) ইকরামা (রঃ) সবাই নবী সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম উনার সঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলার দর্শনের পক্ষেই মত প্রকাশ করেছেন। (ইমাম তিরমীজি (রহঃ) সূত্রে তফসিরে ইবনে কাসীর থেকে সংকলিত) ইমাম নাসায়ী (রহঃ) ইবনে আব্বাস (রঃ) থেকেও এরূপই বর্ণনা করেছেন।
তারপর তিনি (আল্লাহ) কাছে আসার পর সরাসরি দেখা হয়েছিল। মুসনাদে আহমাদে রয়েছে রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন,-"আমি আমার মহামহিমাম্বিত প্রতিপালক-কে দেখেছি" ইবনে কাছিরের তফসীরে উল্লেখ আছে এই হাদীসটির ইসনাদ সহীহ্ এর শর্তের উপরে রয়েছে।
অতঃপর তিনি (আল্লাহ্) রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর দিকে অগ্রসরর হলেন অর্থাত (নিচে নেমে আসলেন) [যেমন উদাহরণ স্বরুপ বলতে পারি, আমাদের কাছে মেহমান আসলে আমরা আলিঙ্গনের জন্য এগিয়ে যাই] তদ্রুপ আল্লাহ্ তা'আলা তার হাবীব-কে শুধু উপরে নিয়ে যাননি, তিনি সয়ং নিচে নেমে আসলেন। এটাই হল হুজুরের প্রতি আল্লাহর সন্মান প্রদর্শন।
[আহলে সুন্নতের অনুসারী আলেমগণ আল্লাহ্ ও রসুলের আদবের দিকে লক্ষ্য করে তুমি না লিখে আপনি লিখে থাকেন। অনেকে তাতে অতিরিক্ত মনে করে থাকেন। এখানেই প্রমান আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর হাবীবকে কতটুকু সন্মান করেছেন]
অতঃপর উভয়ই মধ্যম স্থানে শুন্যে স্থির হলেন কাছাকাছি অবস্থান হলেন।(সুরা নজম : ৮)
এমন কাছে আসলেন যা পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় (দুই ধনুক) আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,- "ফলে উভয়ের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম।" (সুরা নজম : ৯)
দুই ধনুকের বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়, অনেকের মতে তা দুই হাত আবার কারো কারো মতে এক হাত, আবার কারো মতে দুই কামান অর্থাত বিভিন্ন মতবাদ পাওয়া যায়। কিন্তু এর প্রকৃত রহস্য সম্ভবত নিচের লাইন কয়টি পড়লেই সহজে বুঝতে দেরি হবেনা। তৎকালে আরব জাতী তাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ট বুঝাতে ধনুক ব্যবহার যে ভাবে করত ঠিক সেইবাবেই হবে।
তা ছিল দু'টি ধনুক পাসাপাশি রাখলে তা বৃত্তাকারে দেখা যেত (পাশাপাশি) জোড়া (#দুই_ধনুক) আর দুই ধনুকের দুরত্ব নেই বললেই চলে। ছবিতে তা দেখানো হল।
যা আমি ছবিতে বুঝাবার চেষ্টা করলাম, যেন পাঠক সহজে বুঝে নিতে পারেন। আল্লাহ্ তা’আলা আরবদেরকে বুঝাবার জন্য তাদের রীতিনীতিরই উপমা দিয়েছেন ‘দুই ধনুক’।
আল্লাহ তা'আলা শুধু এতটুকুতে বিরত হননি, তিনি তাঁর হাবীবকে সান্নিধ্যে বুঝাবার জন্য ধনুকের উপমা দিলেন। বস্তুত কোন দুরত্ব রাখেননি। যা বুঝা যায় উক্ত আয়াতে। ইরশাদ করেন, - "বর়ং আরও অধিকতর নিকটবর্তী হয়েছেন"। (সূরা নজম : আয়াত- ৯)।
তা কোন অবস্থায় দেখেছেন আল্লাহর রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-ই ভাল জানেন।
পরবর্তী পর্ব
দিদারে এলাহী

Comments
Post a Comment