মে’'রাজ (পর্ব- ১০) দিদারে এলাহী
রসূলুল্লাহ (সঃ) এর মে'রাজ (পর্ব- ১০)
দিদারে এলাহী
রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, আমি আমার রবকে অত্যন্ত সুন্দর লোমশুন্য যুবকের আকৃতিতে দেখেছি।(সিররুল আশরার) আমি এইটা বলতে চাচ্ছিনা আল্লাহ লোমশুন্য যুবকের মত। যেমন পূর্বেই উল্লেখ করেছি তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আলোক পিন্ডের ন্যায় দেখেছিলেন, মুসা আলাইহিস্সালাম আগুনের ন্যায় দেখেছিলেন, এই সব কিছুই আল্লাহর আকৃতি নয়। তিনি তার বহু উর্ধে যা একমাত্র রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ছারা অন্য কারো কল্পনার বাহিরে। আমরা শুধু এতটুকু বুঝে নেব তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মহান আল্লাহ্ তা'আলাকে সরাসরি দেখেছেন (ইহাই ঈমান) কিভাবে তা আমাদের বিষয় নয়।
অতঃপর উভয়ের মধ্যে বাক্য-বিনিময় হল। [এই কথোপকতন অনেক আলেম-ওলামা মনে করেন সত্তর হাজার পর্দার অন্তরাল থেকে করেছেন। এটা তাদের ভ্রান্ত ধারনা ] ‘আরো কাছে’ শব্দ দ্বারায় তার সুযোগ বাকী রইলনা।
চুড়ান্ত পর্বের শুরুতে তখন রসুল সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলা উনার উদ্দেশ্যে সন্মানসূচক ভাবে তাহিয়্যা (উপহার) পেশ করলেন এইভাবে, যা আমরা সকলে নামাজে বৈঠকে পড়ি কিন্তু তার উৎস জানিনা। জানলে অবশ্যই সেই নবীকে নামাজে আমাদের স্মরণে আসবেই, যিনি মেরাজের শুভলগ্নেও আমাদেরকে ভুলেন নাই।
আজকাল অনেকেই ফতোয়া দেয় নামাজে নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে স্মরণে আসলে শির্ক হবে কিংবা গরু / গাধার স্মরণে আসার মত (নউজুবিল্লাহ্) । অথচ যারা বুঝে পড়বে তাদের স্মরণে অবশ্যই নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে স্মরণে আসবে। কারণ রসূলুল্লাহ'র সেই তাহিয়্যা ছিল নিন্মরুপ - রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ্ তা'আলা উনার কাছে পেশ করলেন : -
"আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াসসালাওয়াতু ওয়াত্তয়্যিবাত"। অর্থাত; যা তাশাহুদের শুরুতেই পড়ি। তার অর্থ - (“সকল মর্যাদাব্যঞ্জক ও সম্মানজনক সম্বোধন আল্লাহর জন্য। সমস্ত শান্তি, কল্যাণ ও প্রাচুর্যের মালিক একমাত্র আল্লাহ্। সর্ব প্রকার পবিত্রতার মালিকও তিনি অর্থাত (আপনি)।”
এক কথায় রাসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আর্থিক, শারিরীক ও মৌখিক সব ধরনের ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্য তোহফা (উপহার) হিসেবে পেশ করলেন এই তিনটি জিনিষ।
প্রত্যুত্তরে আল্লাহ্-তা'আলা সন্তুষ্ট হয়ে জবাব বা বিনিময় দিলেন তিনটি (যা তাসাহুদে পড়ে থাকি) - "আসসালামু আ’লাইকা আইয়্যুহান্ নাবিয়্যু ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু" ( হে নবী ! আপনার প্রতি শান্তি, আল্লাহর অনুগ্রহ ও বরকত বর্ষিত হোক।)
উম্মতের কান্ডারী নবী করিম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এমন রবের সাথে মিলন মুহুর্তেও তাঁর উম্মতকে ভুলেন নাই। আল্লাহর অনুগ্রহ তাঁর উম্মতের তাদের জন্য ! (যারা নামাজেও নবীকে স্মরণ রাখে) জন্যও চেয়ে নিলেন, তিনি শুধু নিজের জন্য এককভাবে নিলেননা। যা নামাজের তাসাহুদে স্থান পেয়েছে এভাবে -
"আসসালামু আ’লাইনা ওয়াআ’লা- ই’বাদিল্লাহিস সালিহীন" (আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর সকল নেক বান্দাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক)।
যা এখন আমরা নামাজের মধ্যে তাহিয়্যাতে পড়ে থাকি যার নাম তাশাহুদ (তাহিয়্যা) তাই মুমিন লোকেরা নামাজের মধ্যে মেরাজের স্বাধ অনুভব করে থাকেন। তাইতো নবীজি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ মুবারক করেন, “নামাজ মুমিন বান্দার জন্য মেরাজ স্বরূপ”। মেরাজে যে নৈকট্য ও সাহ্নিধ্য হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অনুভব করেছিলেন তা নামাজে কিছুটা উপলব্ধি করা যায়। যদি মহব্বতের সহিত এই তাশাহুদের (তাহিয়্যা) উৎস মনে থাকে। তখন সেই সব নেয়ামত অর্জন হবে, যা তাসাহুদে আল্লাহ্ তা’আলা দিয়েছেন।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা রসূল সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম-কে গোপনীয় ও প্রকাশ্য যা কিছু বলার তা জানিয়ে দিলেন। যার মধ্যে ছিল তিন ধরনের ওহি। এক উম্মতের নসীহতের জন্য, দ্বিতীয় রসূল সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের ইচ্ছা হলে প্রকাশ করার শর্তে। তৃতীয় গোপনীয়তা রক্ষা করার শর্তে।
যা আমরা বিভিন্ন হাদিসের আলোকে জানতে পারি। যেমন উদাহরণ স্বরুপ একটি হাদিসের উল্লেখ করতে পারি, যথা ;-
একদিন রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মা আয়েশা (রাঃ) কে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আয়েশা (রঃ), আজকে আমি অনেক খুশি, তুমি আমার কাছে যা চাইবে তাই দেব, বল তুমি কি চাও?
হযরত আয়েশা (রাঃ) চিন্তায় পড়ে গেলেন, হঠাৎ করে তিনি এমন কি চাইবেন, আর যা মন চায় তা তো চাইতে পারেন না ! যদি কোন ভুল কিছু চেয়ে বসেন, নবীজী যদি কষ্ট পেয়ে যান? এমন অনেক প্রশ্নই মনে জাগতে লাগলো ! আয়েশা (রাঃ) নবীজী কে বললেন, আমি কি কারো কাছ থেকে কিছু পরামর্শ নিতে পারি?
নবীজী বললেন, ঠিক আছে তুমি পরামর্শ নিয়েই আমার কাছে চাও। আয়েশা (রাঃ) হযরত আবুবকর (রাঃ) এর কাছে পরামর্শ চাইলেন। আবুবকর (রাঃ) বললেন, যখন কিছু চাইবেই, তাহলে তুমি রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে, মি'রাজের রাতে আল্লাহ পাক রাব্বুল আ’লামীন এর সাথে জ্ঞাত হইছে এমন কোন গোপন কথা জানতে চাও। আর কথা দাও নবীজী যা বলবেন তা সর্বপ্রথম আমাকে জানাবে। আয়েশা (রাঃ) নবীজি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার কাছে গিয়ে মিরাজের রাতের যে কোন এক গোপন কথা জানতে চাইলেন, যা এখনও কাউকে বলেন নি। নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মুচকি হেসে দিলেন, বললেন ! বলে দিলে আর গোপন থাকে কি করে !
একমাত্র আবুবকর ই পারেন এমন বিচক্ষণ প্রশ্ন করতে। রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলতে লাগলেন,
হে আয়েশা আল্লাহ আমাকে মিরাজের রাতে বলেছেন, “হে হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আপনার উম্মাতের মধ্যে যদি কেউ, কারো ভেঙ্গে যাওয়া মন জোড়া লাগিয়ে দেয় তাহলে আমি তাহাকে বিনা হিসাবে জান্নাতে পৌঁছে দেব। ছোবহানাল্লাহ্ ।
অনেকে মানুষকে গোমরা করার জন্য বলে থাকেন নবিজী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহকে চোখে দেখেননি তাদের দলিল হিসাবে তারা বলতে চায়, দুনিয়ার চোখে কেহই আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে সক্ষম নয়। কেহ যদি নবীজি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ্'কে না দেখে থাকেন বলে মনে করে সে আল্লাহর কিতাবের উপর অবিশ্বাস করার মত।
তাহলে দেখি আল্লাহ কি বলেন,-
'তিনি যা দেখেছেন অন্তর তাকে অস্বীকার করেনি'। (সূরা নজম : আয়াত ১১)। তাহলে বুঝা যায় তিনি দেখেছেন এবং অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করেছেন এবং স্বীকার করেছেন । [ যেমন আমরা বলি নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছেনা ] এখানে রসুলুল্লাহ্ চোখে দেখেছেন এবং অন্তরে কোন প্রকার সংশয় ছিলনা।
যখন তিনি মি’রাজের কথা প্রকাশ করলেন।
এই কথার উপর বিনা দ্বিধায় বিশ্বাস করে আবুবকর (রঃ) হয়েগেলেন সিদ্দীকে আকবর। আবার কিছু লোক ইমান আনার পরে মি’রাজ নিয়ে রসুলুল্লা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উনার বাণী অস্বীকার করে করে হয়ে গেল মুর্তাদ (খারীজ)।আবার রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-উনার উপর ইমান আনার পরেও যারা সন্দেহ পোষন করল তারা হয়ে গেল মুনাফেক। এই যুগে এসে আমরা সবাই নিজেকে মুমিন দাবি করছি,আসলেই কি আমরা মুমিন? নাকি মুনাফেক বা মুর্তাদ, তা বিবেচনা হবে আমাদের আক্বীদা ও বিশ্বাসের উপর। পবিত্র কুরআনুল করিমে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, 'সেদিন কারো প্রতি অবিচার করা হবেনা', প্রত্যেকেই তার কর্মফল পাবে। সুতরাং অপরাধীকে সাজা দেওয়াও ন্যায় বিচার। ইবলিশ শয়তান একমাত্র রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ছারা সব কিছুর বেশ ধারণ করতে পারে। দাড়ী টুপী ওয়ালা আলেমের বেশ ধারণ করা তার জন্য কোন ব্যপারই নয়। আমি আর আপনি তার জন্য কিছুই না। সে তো আদম আলাইহিস্সালাম উনাকে ধোকা দিযেছিল, যদিও নবীদেরকে ধোকা দেয়া তার সাধ্যের বাহিরে। তা আল্লাহ আমাদেরকে ইবলিশের প্ররোচনা দেখাবার জন্য ঘঠিয়েছিলেন। যেন পরবর্তীতে মুমিন বান্দা ইবলিশের প্ররোচনায় বিপথগামী হতে একটু বিবেককে খাঠায়।
তার পরও যারা বলে মেরাজ রজনীতে নবীজি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ্'র দিদারে (সাক্ষাতে) ধন্য হননি তাদের ছদ্মবেশী ইবলিশ ছারা আরকিছু মনে করা গোমরাহী ছারা কিছুই নয়। আল্লাহ্ আমাদের সেই সকল ছদ্মবেশী আলেমে 'ছু' থেকে রক্ষা করুন।আমিন।
[ছোবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, ছোবহানাল্লাহিল আজীম ওয়া বিহামদিহি আসতাগফিরুল্লা ওয়া আতুবু ইলাইহ্]।

Comments
Post a Comment