হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু :
আবু উবাইদা ৫৮৩ সালে বণিক আবদুল্লাহ ইবনুল জাররাহর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কুরাইশের বনু আল হারিস ইবনে ফিহর গোত্রের সদস্য ছিলেন। তাঁর পুরো নাম আমের ইবনে আবদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ আল ফিহ্রি আল কোরাইশি। তবে তিনি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ নামে ইতিহাসে সমধিক খ্যাত। তাঁর বাবার নাম আবদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ। তাঁর মা-বাবা উভয়েই ছিলেন 'ফিহ্র' খান্দানের লোক। হজরত আবু উবাইদা (রাঃ)-এর পঞ্চম ঊর্ধ্বতন পুরুষ 'ফিহ্র'-এ গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বংশধারার সঙ্গে মিলিত হয়। ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও তিনি অন্যতম অভিজাত কুরাইশ বলে গণ্য হতেন। তাঁর অমায়িকতা ও সাহসিকতার জন্য তিনি খ্যাত ছিলেন। তিনি ছিলেন উজ্জ্বল চেহারা, জ্যোতির্ময় ললাট, শীর্ণদেহ, দীর্ঘকায় ও কোমল কপালের অধিকারী৷ তাছাড়া তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, দারুন লজ্জাশীল৷ কিন্তু কোন বিষয় প্রকট আকার ধারণ করলে এবং ভয়ঙ্কর রূপ নিলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়া নেকড়ের ন্যায় হয়ে যেতেন৷ তিনি সৌন্দর্যে ও উজ্জল্যে তরবারীর ফলার ন্যায় ছিলেন৷ তিক্ষ্ণতা ও প্রখরতার ক্ষেত্রে তিনি তরবারীই উপমা ধারণ করতেন৷ তিনি হলেন প্রীয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি৷
হযরত আবু উবায়দা (রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী ব্যক্তিদের মাঝে ছিলেন৷ হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ইসলাম গ্রহণের পরদিনই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন৷ তিনি আবু বকর সিদ্দিক (রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) এর হাতেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন৷ হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু তাঁকে সহ আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, ওসমান ইবনে মাজুন এবং আরকাম ইবনে আবুল আরকাম (রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুম) কে নিয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট গেলেন৷ তাঁরা তাঁর সামনে চিরন্তন সত্যের কালিমা পাঠ করলেন৷ তাই তাঁরা ছিলেন প্রথম বুনিয়াদ যার উপর ইসলামের মহান প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছে৷ তিনি ছিলেন আশরায়ে মুবাশ্বেরা (জান্নাতী দশ সাহাবী) উনাদের একজন।
আবু উবায়দা (রাঃ) মক্কায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের মাঝে নিপীড়ণের পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে রইলেন এবং অগ্রগামী মুসলমানদের সাথে এমন দুঃখ-বেদনা, কষ্ট-যাতনা ও নির্যাতন-নিপিরণের প্রচন্ডতা সহ্য করলেন যা পৃথিবীর বুকে অন্য কোন ধর্মের অনুসারীরা সহ্য করেনি৷ তিনি পরীক্ষার সম্মুখে অটল-অবিচল রইলেন এবং সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথাকে সত্যরূপে মেনে নিলেন৷
বদরের যুদ্ধের দিন হযরত আবু ওবায়দা রদিআল্লাহু তা'আলা আনহু নির্ভীক মরণজয়ী যোদ্ধার ন্যায় ব্যুহের পর ব্যুহ ভেদ করে আক্রমণ করতে লাগলেন৷ ফলে মুশরিকরা ভয় পেয়ে গেল৷ নিঃশঙ্ক মরণজয়ী যোদ্ধার ন্যায় ঘুরতে লাগলেন৷ ফলে কোরাইশের অশ্বারোহী যুদ্ধারা ভয় পেয়ে গেল৷ তারা তার মুখোমুখি হলেই পাশ কেটে যেতে লাগলো৷ আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে দিলেন ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষায়। এক ব্যক্তি সবদিক থেকে আবু ওবায়দা রদিআল্লাহু তা'আলা আনহু এর মুখোমুখি হতে লাগল। লোকটি ভীষণ আক্রমণ করল৷ আবু ওবায়দা (রদিআল্লাহু তা'আলা আনহু) তার থেকে দূরে সরে পড়তে চাইলেন৷ লোকটি আবু ওবায়দা রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু এর সব পথ বন্ধ করে দিলেন এবং তাঁর মাঝে ও আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করে দাঁড়াল৷ অবশেষে তিনি তরবারি দিয়ে তার মাথায় এমন আঘাত করলেন যে, তার শির দ্বিখন্ডিত হয়ে গেল এবং তাঁর সামনে লুটিয়ে পড়ল৷ লুটিয়ে পড়া এ ব্যক্তটি হলেন আবু ওবায়দা (রদিআল্লাহু তা'আলা আনহু) এর পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে জাররাহ৷
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু তার পিতাকে হত্যা করেননি, বরং তিনি তার পিতার ব্যক্তিত্বে লুকায়িত শিরককে হত্যা করেছেন৷ কার্যে পরিনত হল আল্লাহ্ তা'আলার সেই উক্তি। যাহা পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে এভাবে-
আল্লাহ তাআলা বলেন- "যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধচারণ কারীদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে দেখবেন না৷ যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভাই,কিংবা বংশের লোক হয়৷ তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে তার অদৃশ্য শক্তি দ্বারা শক্তিশালী করেছেন৷ তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশ দিয়ে নির্ঝরমালা প্রবাহিত৷ তারা সেখানে চিরকাল থাকবেন৷ আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট৷ তারাই আল্লাহর দল৷ জেনে রাখ, আল্লাহর দল সফলকাম হবে৷ (সূরা মুজাদালা- 22)
আবু ওবায়দা রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু এর জন্য এটা কোন বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল না৷ কারণ আল্লাহর উপর তার ঈমান, দ্বীনের জন্য তার কল্যাণকামিতা, আর মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মতের জন্য তাঁর বিশ্বস্ততা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যার প্রতি আল্লাহর অনেক প্রিয় বান্দারা হয়েছিল লোভাতুর৷
মুহাম্মাদ ইবনে জাফর বর্ণনা করেন,খৃষ্টানদের একটি দল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এল৷ বলল, হে আবুল কাসেম! আপনার সাথীদের মধ্য হতে এমন একজনকে আমাদের সাথে পাঠান যার ব্যাপারে আপনি সন্তুষ্ট হবেন৷ আমরা কিছু ধন-সম্পদ নিয়ে মতবিরোধ করছি সে আমাদের মাঝে তার ফায়সালা করে দিবে৷ আর আপনারা তো আমাদের নিকট প্রিয়ভাজন৷
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা বিকালে আমার নিকট আস, আমি তোমাদের সাথে শক্তিশালী বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে পাঠাব৷
হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বলেন, আমি তাই তাড়াতাড়ি জোহরের নামাজ পড়তে গেলাম৷ সেদিনই আমি নেতৃত্বকে ভালোবেসেছিলাম৷ আশা ছিল আমি এ গুণ সম্পন্ন ব্যক্তি হব৷ রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জোহরের নামাজ পড়ালেন৷ তারপর ডানে ও বামে তাকাতে লাগলেন৷ আমি তার দৃষ্টির সামনে দীর্ঘ হতে লাগলাম, যেন তিনি আমাকে দেখেন৷ আর তিনি আমাদের মাঝে তার দৃষ্টি ফেরাতে লাগলেন৷ অবশেষে আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কে দেখলেন৷ তিনি তাকে ডেকে বললেন, তাদের সাথে যাও, তারা যে বিষয়ে মতবিরোধ করছে ন্যায়সঙ্গত ভাবে তার ফয়সালা কর৷ আমি তখন বললাম, আবু ওবায়দা তো সে গুণের অধিকারী হয়ে গেল৷
আবু উবায়দা রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু শুধুমাত্র বিশ্বস্তই ছিলেন না৷ বিশ্বস্ততার সাথে তিনি শক্তিরও অধিকারী ছিলেন৷ বেশ কিছু ক্ষেত্রে তাঁর এই শক্তির বিকাশ ঘটেছে৷ যেদিন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কুরাইশদের একটি কাফেলার মুখোমুখি হওয়ার জন্য একদল সাহাবীকে পাঠালেন এবং আবু ওবায়দা রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু কে তাদের আমির নিযুক্ত করলেন আর পাথেয় স্বরূপ তাদেরকে এক থলে খেজুর দিলেন৷ দেয়ার জন্য অন্য কিছু পেলেন না, সেদিন তার শক্তির বিকাশ ঘটেছিল৷ তখন আবু ওবায়দা রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু প্রত্যেকদিন তার সাথীদের একটি করে খেজুর দিতেন৷ প্রত্যেকে তা শিশু মায়ের দুধ চুষে খাওয়ার পর ন্যায় চুষে খেত৷ তার পর পানি পান করত৷ এটাই রাত পর্যন্ত তাদের জন্য যথেষ্ট হত৷
উহুদের দিনে যখন মুসলমানগন পরাজিত হলেন আর মুশরিকরা চিৎকার করে ডাকতে লাগল, 'মুহাম্মাদ কোথায় আছে দেখিয়ে দাও' 'মুহাম্মদ কোথায় আছে দেখিয়ে দাও' আবু উবায়দা রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু তখন ঐ দশজনের একজন ছিলেন যারা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে ঘিরে মুশরিকদের বর্ষাগুলো নিজ দেহ পেতে প্রতিহত করছিলেন৷
যুদ্ধ শেষ হলে দেখা গেল, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেছে৷ তাঁর ললাট আক্রান্ত হয়েছে এবং বর্মের দুটি আংটা তাঁর ললাটে বিদ্ধ হয়েছে৷ আবূ বকর সিদ্দিক রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু তা তার কপাল থেকে তুলে ফেলতে অগ্রসর হলেন৷ তখন আবু ওবায়দা রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু তাঁকে বললেন আল্লাহর কসম দিয়ে আমি আপনাকে বলছি, অনুগ্রহ করে তা আমার জন্য ছেড়ে দিন৷ আবু বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু তা তার জন্য ছেড়ে দিলেন৷ আবু ওবায়দা রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ভেবে দেখলেন, যদি তিনি তা হাত দিয়ে উপড়ে ফেলেন তাহলে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে তা কষ্ট দিবে৷ তাই তিনি সামনের দাঁত দিয়ে একটি আংটা মজবুত করে কামড়ে ধরলেন৷ তারপর তা তুলে ফেললেন৷ আর তার সামনের দাঁত পড়ে গেল৷ অতঃপর সামনের অপর দাঁতটি দিয়ে দ্বিতীয় আংটাটি কামড়ে ধরলেন ও তা তুলে ফেললেন৷ ফলে তার সামনে অপর দাঁতটি পড়ে গেল৷
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু তাই বলতেন তাই আবু উবায়দা রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু সামনের দাঁতহীন মানুষদের মাঝে সবচেয়ে সুন্দর মানুষ ছিলেন৷
রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সাহচর্য অবলম্বন করার পর থেকে রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর ইন্তেকাল পর্যন্ত আবু ওবায়দা রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু সবগুলো যুদ্ধেই তাঁর সাথে ছিলেন৷ সাকাফীর দিনে হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু আবু ওবায়দা রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুকে বললেন, আপনার হাত প্রসারিত করুন আমি আপনার বাইয়াত গ্রহণ করব৷ কারণ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, "নিশ্চয় প্রত্যেক জাতির এক বিশ্বস্ত লোক থাকে আর তুমি হলে এ জাতির বিশ্বস্ত ব্যক্তি"৷
তখন হযরত আবু ওবায়দা রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বললেন, আমি এমন দুঃসাহসী নয় যে, ঐ ব্যক্তির মৃত্যুর পূর্বে তাঁর সম্মুখে অগ্রসর হবো যাকে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নামাজে আমাদের ইমাম হতে নির্দেশ দিয়েছেন৷ অতঃপর তিনি আমাদের ইমাম হয়েছেন৷
তারপর তিনি আবু বকর রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর হাতে বায়াত গ্রহণ করলেন৷ তাই আবু উবায়দা রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু সত্যের ক্ষেত্রে তাঁর জন্য ছিলেন উত্তম উপদেশ দানকারী আর কল্যাণের ক্ষেত্রে তার জন্য ছিলেন উত্তম সাহায্যকারী৷
অতঃপর হযরত আবু বকর রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুকে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করলে আবু ওবায়দা রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু তার অনুগত হয়ে রইলেন৷ মাত্র একবার ছাড়া কখনও তাঁর অবাধ্য হননি৷ এখন হয়ত পাঠক আপনাদের মনে একটু খটকা লেগেছে ! তাও জেনে নিন- তা কখন ঘটেছিল।- যখন আবু ওবায়দা রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু শামে ছিলেন৷ এক রণক্ষেত্র বিজয় লাভ করার পর আরেক রণক্ষেত্র বিজয় করার জন্য মুসলিম বাহিনীকে নিয়ে ছুটে চলছিলেন৷ ফলে আল্লাহ্ তাআলা তার হাতে শামের সবগুলো দেশ বিজয় করলেন৷ পূর্বে ফোরাত নদী আর উত্তরে এশিয়া মাইনরে পৌঁছে গেলেন৷
তখন সহসা শামে এমন মহামারী দেখা দিলো যার মত ভয়ংকার মহামারী মানুষ কখনো দেখেনি৷ ফলে মহামারীতে অগণিত মানুষ মৃত্যুবরণ করতে লাগল৷ হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এ সংবাদ শুনেই সংবাদপত্রসহ একজন দূত আবু ওবায়দা রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর নিকট পাঠিয়ে দিলেন৷ তিনি তাতে লিখলেন— "তোমার নিকট আমার এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন দেখা দিয়েছে তুমি ছাড়া আর কারো দ্বারা তা পূরণ হবার নয়৷ যদি আমার পত্র তোমার নিকট রাতে এসে পৌঁছে, তাহলে আমি তোমাকে কসম দিয়ে বলছি, তুমি আমার নিকট আসার পথে অশ্বারোহণ ছাড়া সকাল করবে না৷ আর যদি তোমার নিকট দিনে পৌঁছে, তাহলে আমি তোমাকে কসম দিয়ে বলছি, আমার নিকট আসার পথে অশ্বারোহণ ছাড়া সন্ধ্যা করবেনা"৷
আবু উবাইদা রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ওমর ফারুক রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর পত্র নিয়ে বললেন, আমার নিকট আমীরুল মুমিনীনের প্রয়োজনের বিষয়টি বুঝে ফেলেছি৷ তিনি তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাচ্ছেন যে বাঁচবে না৷ তারপর পত্রের উত্তর লিখে পাঠালেন— "হে আমীরুল মুমিনীন ! আমার নিকট আপনার কি প্রয়োজন আমি তা বুঝে ফেলেছি৷ আমি মুসলমানদের মুজাহিদ বাহিনীতে রয়েছি৷ আর আমি যে মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হব তা থেকে বাঁচার আমার কোন আগ্রহ নেই৷ আল্লাহ আমার ও তাদের মাঝে ফয়সালা করার পূর্বে আমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাই না৷
সুতরাং আমার উত্তরপত্র আপনার নিকট পৌছালে আপনার প্রতিজ্ঞা থেকে আমাকে মুক্তি দিন এবং আমাকে শামে থাকার অনুমতি প্রদান করুন"৷
হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু উত্তরপত্র পাঠ করে কেঁদে ফেললেন৷ তার চোখ উপচে অশ্রু প্রবাহিত হলো৷ তখন তার কান্নার প্রবণতা দেখে মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিরা বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আবু উবাইদা কি মৃত্যুবরণ করেছেন? হযরত উমর রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বললেন, না তিনি মৃত্যুবরণ করেন নি; তবে তাঁর মৃত্যু অদূরে৷
হযরত ওমর ফারুক রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর ধারণা মিথ্যা হয়নি৷ কেননা শীঘ্রই তিনি মহামারীতে আক্রান্ত হলেন৷ অতঃপর যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলো তিনি মুজাহিদ বাহিনীকে ওসিয়ত করে বললেন—
"আমি তোমাদের এমন একটি ওসিয়ত করব তোমরা যদি তা গ্রহণ কর তবে সর্বদা কল্যাণে থাকবে৷
তোমরা সালাত কায়েম করো৷ রমজান মাসে রোজা রাখো৷ দান -সদকা করো৷ হজ্জ ও উমরা আদায় কর৷ একে অপরকে কল্যাণের অসিয়ত করো৷ তোমাদের শাসকদের কল্যাণ কামনা কর৷ স্বার্থ অর্জনের জন্য তাদের নিকট যেও না৷ আর দুনিয়া যেন তোমাদের উদাস করে না ফেলে৷ কারণ যদি কোন মানুষকে হাজার বৎসরের আয়ু প্রদান করা হয় তাহলেও তাকে অবশ্যই আমার এই স্থানে পৌঁছতে হবে যেখানে তোমরা আমাকে দেখছো৷ আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ ৷
তারপর মুয়াজ ইবনে জাবাল রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর দিকে ফিরে তাকালেন৷ বললেন, হে মুয়াজ! ইমাম হয়ে লোকদের নামাজ পড়াও৷ এর অনতিকাল পরেই তিনি ইন্তেকাল করলেন৷ মুসলিম উম্মাহ্ হারালো তাদের আমানতদার সাহাবীকে। তখন মুয়াজ রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু দাঁড়িয়ে বললেন—
"হে লোকেরা ! নিশ্চয় তোমরা আজ এমন এক মহান ব্যক্তিকে হারিয়ে ব্যথিত হয়েছো, আল্লাহর কসম করে বলছি! আমি জানিনা তার চেয়ে অধিক পুণ্যবান হৃদয়ের অধিকারী, তার চেয়ে অধিক হিংসা-বিদ্বেষ দূরবর্তী ব্যক্তি, শেষ শুভ পরিনামের ব্যাপারে তার চেয়ে অধিক কাঙ্খিত ব্যক্তি এবং তার চেয়ে অধিক জনকল্যাণকামী ব্যক্তি দেখছি কি না? সুতরাং তোমরা তার জন্য রহমতের দোয়া কর৷ আল্লাহ তোমাদের উপর রহমত বর্ষণ করবেন৷
পরিশেষে দোয়া করি- আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর অনুগত সাহাবী গনের তথা 'আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত' এর পথের পথিক করুন। যার জন্য আমরা প্রতিদিন নামাজে আর্জি করে থাকি-"ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম" (সুরা ফাতেহা : ৫) অর্থাত “আমাদিগকে সরল পথ দেখিয়ে দিন” আমিন ইয়া রব্বে মুস্তফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)।

Comments

Popular posts from this blog

কারামত - (আনা সাগরের পানি ছোট্ট পাত্রে চলে আসার রহস্য)

প্রকৃত সাধক তার উপযুক্ত মুরীদকেই সাজ্জাদানশীল করেন

মে’'রাজ (পর্ব- ১)