বেহেস্ত এবং বেহেশতবাসী
বেহেস্ত এবং বেহেশতবাসী
📚তাম্বীহুল গাফেলীন ✍🏻আবুল লাইস সমরকন্দি (রহঃ)
বেহেশতের হাকীকত—
হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন- আমরা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করিলামঃ বেহেশত কিসের তৈয়ারী?
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উত্তর দিলেন, পানির তৈয়ারী।
আমরা বলিলাম, আমাদের উদ্দেশ্য বেহেশতের অট্টালিকা নিমার্ণ সম্পর্কে অবগত হওয়া।
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ বেহেশতের একটি ইট স্বর্ণেরঅপরটি রূপার আর প্রলেপ হইল মেশকের, ইহার মাটি জাফরানের আর কংকর মুক্তা এবংইয়াকুতের । যে ব্যক্তি বেহেশতে প্রবেশ করিবে সে কোন প্রকার নেয়ামত হইতে বঞ্চিত ও নিরাশথাকিবে না। সে ব্যক্তি অনন্তকাল তথায় বসবাস করিবে। কখনো তাহার মৃত্যু হইবেনা।তাহার পরিধেয় ভুষণ কখনো পুরাতন হইবে না। যৌবনও অটল থাকিবে।
অতঃপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ তিন ব্যক্তির দোয়াফিরাইয়া দেওয়া হয় না।
(১) আদেল ইমাম অর্থাৎ ন্যায়পরায়ন বাদশা ও বিচারক।
(২) রোযাদারের দোয়া ইফতারের সময়।
(৩) অত্যাচারিত ব্যক্তির দোয়া, তাহার প্রার্থনা মেঘের উপরে উঠাইয়া নেওয়া হয়।
আল্লাহ তা’আলা বলেন, কিছু বিলম্ব হইলেও আমি অবশ্যই তোমার সাহায্য করিবে।
বেহেশতের বৃক্ষ —
📚তাম্বীহুল গাফেলীন ✍🏻আবুল লাইস সমরকন্দি (রহঃ)
রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেনঃ বেহেশতে একটি বৃক্ষআছে। যাহার ছায়ায় বেহেশতবাসীগণ শত বৎসর চলার পরেও উহার ছায়া অতিক্রম করিতেপারিবেনা, অধিকন্তু তাহারা এইরূপ নেয়ামত সমূহ পাইবে, যাহা কোন চক্ষু কখনওঅবলোকন করে নাই, কোন কর্ণ উহার বর্ণনা কখনও শ্রবণ করে নাই এবং কোন অন্তর উহারকল্পনাও করে নাই। কুরআন মজিদে বর্ণিত হইয়াছে— “কেহই জানেনা যে, সেখানে চক্ষুরপ্রশান্তি প্রদানকারী কি লুকাইয়া রাখা হইয়াছে।” বেহেশতের একটা সামান্য বিন্দু পরিমাণস্থানও দুনিয়া এবং দুনিয়াতে যাহা কিছু আছে তাহা হইতে উত্তম।
বেহেশতের হুর ‘লায়বা’—
হযরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহুআলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেনঃ বেহেশতে লায়বা নাম্নী এক হুর রহিয়াছে।চার বস্তুর সমন্বয়ে তাহাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে যথা-
(১) মেশক (২) আম্বর (এক প্রকার সুগন্ধি দ্রব্য) (৩) কর্পূর (ইহাও এক প্রকার সুগন্ধি বিশেষ) (৪) জাফরান। প্রভৃতি উপাদান দ্বারা তাহার শরীর গঠন করা হইয়াছে। বেহেশতের সমস্ত হুরতাহার প্রতি আসক্ত। যদি সে সাগরে থুথু ফেলে, তাহা হইলে সাগরের পনি মিঠা হইয়া যাইবে।তাহার ললাটে লিপিবদ্ধ রহিয়াছে 'যে আমাকে পাইতে চায় সে যেন আল্লাহর অনুগত হয়।'
হযরত মুজাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বেহেশতের ভূমি রূপার এবং মাটি মেশকেরহইবে। আর বৃক্ষ মূল রূপার হইবে। ইহার শাখা প্রশাখা সমূহ মুক্তা এবং জবরজদ পাথরেরনির্মিত হইবে। পাতা এবং ফল হইবে নিম্নমুখী মূল হইবে উর্ধ্ব মুখী। দাঁড়াইয়া বসিয়া, শুইয়াঅর্থাৎ যে ভাবে ইচ্ছা উহার ফল পাড়িতে পারিবে।
বেহেশ্তী ব্যক্তির সৌন্দর্য ও মাধুর্য —
হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন- বেহেশতী ব্যক্তির সৌন্দর্য ও মাধুর্য ক্রমশঃবাড়িতে থাকিবে। পার্থিব জগতে তো ধীরে ধীরে বার্ধক্য নামিয়া আসে। সেখানে রূপযৌবনের মাধুর্যের ক্রমোন্নতি হইতে থাকিবে।
বেহেশতের সবচেয়ে বড় নেয়ামত —
হযরত সুহায়র রাদিআল্লাহু আনহু বলেন- হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেনঃ যখন বেহেশতীরা বেহেশতে এবং দোযখীরা দোযখে চলিয়া যাইবে, তখন এক ঘোষক ঘোষণা করিবে, হে বেহেশত বাসীগণ! আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতি একঅঙ্গীকার করিয়াছিলেন। আল্লাহ পাক উহা পূরণ করিতে চান। তখন বেহেশতীরা বলিবে- সেঅঙ্গীকার কি? আল্লাহ পাক কি আমাদের নেকীর পাল্লা ভারী এবং মুখমণ্ডল আলোকিতকরেন নাই? তিনি কি আমাদেরকে বেহেশতে প্রবিষ্ট করান নাই? তিনি কি আমাদেরকে দোযখহইতে মুক্তি দেন নাই?
হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর ভবিষৎ বাণী মোতাবেক পর্দাউঠাইয়া দেওয়া হইবে। বেহেশতবাসীরা আল্লাহর দিদার লাভে ধন্য হইবে। বর্ণনাকারী
বলেনঃ আল্লাহর শপথ করিয়া বলিতেছি, বেহেশতীদের ইহা অপেক্ষা অধিক প্রিয় এবং উত্তমঅন্য কোন নিয়ামত হইবেনা। হে আল্লাহ! আমাদের সকলকে এই নেয়ামত দান করুন।
সু-সংবাদ প্রদানের এক অদ্ভুত অবস্থায় জিবরাইল (আঃ)-এর আগমন—
হযরত আনাস বিন মালেক রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বর্ণনা একবার জিবরাইল(আঃ) একটি সাদা আয়নাসহ নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট আগমন করেন। উহাতে একটি কাল দাগ ছিল। রাসূলে মাকবুল(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞাসা করিলেনঃ হে জিবরাইল! ইহাকিসের আয়না?
জিবরাইল (আঃ) উত্তর দিলেন- ইহা জুমার দিন সাদৃশ্য। আর কাল দাগটি প্রতি শুক্রবারদোয়া কবুল হওয়ার সময়। আপনাকে এবং আপনার উম্মতকে ইহার দ্বারা (অর্থাৎ জুমারদিন দ্বারা) অন্যান্য উম্মতের উপর প্রাধান্য দেওয়া হইয়াছে। এই দিনে এমন একটি সময়রহিয়াছে যখন প্রতিটি দোয়া কবুল হয়। কিন্তু আমাদের কাছে ইহা একটি অতিরিক্ত দিন।হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞাসা করিলেনঃ অতিরিক্ত দিনেরকি অর্থ ?জিবরাইল (আঃ) উত্তর দিলেন আল্লাহ পাক বেহেশতে একটি ময়দান নির্ধারিতকরিয়া রাখিয়াছেন যে, সেখানে মেশকের একটি টিলা (উচ্চস্থান) রহিয়াছে প্রতি জুমার দিনেসেখানে নূরের মিম্বার বিছাইয়া দেওয়া হয়। উহার উপর আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ) সমাসীনহন। অপর কতগুলি ইয়াকুত ও যবরজদ পাথর খচিত স্বর্ণের মিম্বারে সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ওনেককারগণ উপবিষ্ট হন। মেশকের সে টিলায় আহলে গারফ বসেন (অর্থাৎ সাধারণজান্নাতীগণ)। অতঃপর সকলে একত্রে আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করেন। আল্লাহ পাকঘোষণা করিবেনঃ তোমাদের চাওয়ার আছে চাও! তখন সকলেই আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রার্থনাকরিবেন। আল্লাহ পাক বলিবেনঃ আমি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট আছি। আমি তোমাদেরকেআমার স্থানে বসবাস করার সুযোগ দিয়াছি এবং স্বীয় পক্ষ থেকে সম্মান করিয়াছি। অতঃপরআল্লাহ তায়ালার জ্যোতি (তাজাল্লী) প্রকাশ পায়। আর তাহারা আল্লাহ পাকের জ্যোতিদেখিতে পায়। সুতরাং এইদিনে তাহাদের সম্মান বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে তাহাদের কাছে জুমারদিন অপেক্ষা অধিক প্রিয় কোন দিন নাই ।
অন্য এক রেওয়ায়েতে আছেঃ আল্লাহ পাক ফিরিশতাদিগকে বলিবেনঃ আমার বন্ধুগণকেআহার করাও। অতঃপর ফিরিশতাগণ বিভিন্ন রকম খাদ্য দ্রব্য উপস্থিত করিবেন। আরতাহারা উহার প্রতি লোকমাতে নিত্য নতুন স্বাদ উপভোগ করিবে। পূনরায় আল্লাহর আদেশেপানীয় দ্রব্যাদি উপস্থিত করা হইবে এবং প্রতি ঢোকে নতুন নতুন স্বাদ অনুভব করিবে।তাহাদের পানাহারান্তে আল্লাহ পাক বলিবেনঃ আমি তোমাদের প্রভু! আমি তোমাদের কাছেযে অঙ্গীকার করিয়াছিলাম উহা তো পুরো করিয়াছি। এখন আর যাহা কিছু চাহিবে উহাইদেওয়া হইবে। আল্লাহর বান্দাগণ বার বার আবেদন করিবে যে, আমরা আপনার সন্তুষ্টি চাই।
“আল্লাহ পাক উত্তর দিবেন, আমি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট আছি” এবং আমার কাছে আরওকিছু রহিয়াছে। আজ তোমাদেরকে এমন এক নিয়ামত দান করিব যাহা ঐ সমস্ত নিয়ামতেরঊর্ধ্বে। অতঃপর পর্দা উঠাইয়া দেওয়া হইবে এবং সকলেই আল্লাহর নূর (তাজাল্লী) দেখিতেপাইবে আর তৎক্ষণাৎ সিজদায় পড়িয়া যাইবে। আল্লাহ তায়ালার পূনঃনির্দেশ না হওয়াপর্যন্ত সিজদার অবস্থায় থাকিবে। তারপর আল্লাহ পাক বলিবেনঃ মাথা উঠাও! ইহা ইবাদতকরার স্থান নহে। বেহেশতবাসীরা আল্লাহর দিদার লাভে সকল নিয়ামত ভুলিয়া যাইবে।তারপর আরশের নিম্নদেশ থেকে সুশীতল সমীরণ প্রবাহিত হইতে থাকিবে। মেশকের শুভ্রটিলা হইতে মেশক উঠিয়া জান্নাতিদের মাথা এবং তাহাদের অশ্বসমূহের ললাটে পতিত হইবে।যখন তাহারা (নিজ নিজ বাসভবনে) ফিরিয়া যাইবে। তখন তাহাদের সহধর্মিনীরা বলিবে-“আপনারা তো আরও অধিক সুন্দর ও সুশ্রী হইয়া ফিরিয়াছেন।
হযরত ইকরামা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন-বেহেশতে নারী পুরুষ উভয়েই তেত্রিশ বৎসরবয়স্ক এবং অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারী হইবে। প্রত্যেকের পরিধানে ‘সত্তরটি পোষাকশোভা পাইবে। প্রত্যেক স্বামী স্বীয় সহধর্মিনীর মুখমন্ডল, বক্ষ দেশ ও পাদদেশে স্বীয় দেহাবয়বদেখিতে পাইবে। অনুরূপভাবে স্ত্রীও স্বামীর মুখমন্ডল ইত্যাদিতে স্বীয় অবয়ব দেখিতে পাইবে।তথায় মুখ ও নাসিকা হইতে দুর্গন্ধ যুক্ত কোন কিছু নির্গত হওয়ার কল্পনাও করা যায় না। একহাদীছে আছেঃ যদি কোন জান্নাতী হুর আকাশ থেকে তাহার হাতের তালু পৃথিবীর দিকেখুলিয়া ধরে তাহা হইলে সমগ্র বিশ্ব আলোকিত হইয়া যাইবে।
বেহেশতে পেশাব পায়খানার প্রয়োজন হইবে না—
যায়েদ বিন আরকাম রাদিআল্লাহু আনহু বলেন যে, কোন এক আহলে কিতাব রাসূলুল্লাহ(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)- এর সামনে উপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিল'আপনার মতে বেহেশতে খানাপিনার ব্যবস্থা থাকিবে কি?' রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন-হ্যাঁ। বেহেশতের মধ্যে তো এক ব্যক্তিকে খানাপিনা ও স্ত্রীসহবাসে শত ব্যক্তির সমপরিমাণ শক্তি দেওয়া হইবে। সে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল, খানাপিনার পর তো অবশ্যই পেশাব পায়খানা হইয়া থাকে, বেহেশত হইল পবিত্র স্থান।উহাতে এইসব অপবিত্র জিনিস কিভাবে থাকিতে পারে? রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ বেহেশতে পেশাব পায়খানা করার প্রয়োজন হইবে না।বরং মেশকের সুগন্ধিযুক্ত ঘর্ম নির্গত হইবে শুধু, আর ইহাতেই খাদ্যদ্রব্য হজম হইয়া যাইবে।
বেহেশতে ‘তোবা’ বৃক্ষ —
বেহেশতে ‘তোবা’ বৃক্ষ নামক একটি বৃক্ষ থাকিবে। প্রত্যেক জান্নাতির ঘরে ইহার একটি করিয়াশাখা থাকিবে। আর প্রত্যেক শাখায় বিভিন্ন ধরনের ফল থাকিবে। উটের ন্যায় পক্ষী সমূহউহার উপরে আসিয়া বসিবে। যদি কোন জান্নাতী কোন পক্ষী আহার করার ইচ্ছা করে তখনসাথে সাথে উহা দস্তর খানার উপর আসিয়া যাইবে। ঐ ব্যক্তি একই পক্ষীর এক পার্শ্ব হইতেশুকনা গোশত আর অপর পার্শ্ব. হইতে ভুনা গোশত আহার করিবে। অতঃপর পক্ষীটিউড়িয়া চলিয়া যাইবে।
বেহেশতবাসীর আকৃতি —
ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু এবং আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ আমার উম্মতের সর্বপ্রথম বেহেশতে প্রবেশকারীর মুখশ্রী পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় আলোকিত হইবে। তাহার পরপ্রবেশকারীর মুখশ্রী উজ্জল নক্ষত্রের ন্যায় হইবে। অতঃপর একের পর এক বিভিন্ন আকৃতিলাভ করিবে। বেহেশতে পেশাব পায়খানার প্রয়োজন হইবে না এবং নাকে মুখে দুর্গন্ধময় কোনকিছু সৃষ্টি হইবে না। সেখানকার চিরুনী স্বর্ণের তৈরী হইবে আর সুর্গন্ধ যুক্ত কাঠের তৈয়ারীহইবে। শরীরের ঘর্ম মেশকের ন্যায় সুগন্ধযুক্ত হইবে। সকলের দেহাকৃতি এক ধরনের হইবে।হযরত ঈসা (আঃ)-এর ন্যায় তেত্রিশ বৎসরের যুবক এবং হযরত আদম -(আঃ)-এর ন্যায়ষাট হাত দীর্ঘ শ্মশ্রুবিহীন হইবে । ভ্রু এবং পলক ব্যতীত কোথাও কোন লোম থাকিবেনা।গায়ের রং শুভ্র হইবে। পোশাক সবুজ রংয়ের হইবে। যদি কোন ব্যক্তি আহার করার ইচ্ছায়দস্তর খানা বিছায় তাহা হইলে সম্মুখ হইতে এক পক্ষী আসিয়া বলিবে, হে আল্লাহর ওলী! আমি সালসাবীল নামক প্রস্রবনের পানি পান করিয়াছি। আরশের নীচে বেহেশতের বাগানেঘুরিয়া বেড়াইয়াছি এবং অমুক অমুক ফল ভক্ষন করিয়াছি। তখন সে বেহেশতী পাখীর একপার্শ্ব হইতে রন্ধন করা অপর পার্শ্ব হইতে ভুনা গোশত খাইবে। সত্তর প্রকার পোষাক পরিহিতথাকিবে, তার প্রতিটি পোষাকের রং ভিন্ন হইবে। তাহাদের আংগুল সমূহে দশটি আংটিথাকিবে-
প্রথম আংটিতে লিখা থাকিবে- “তোমরা ইহজীবনে ধৈর্য ধারণ করিয়াছিলে তাই তোমাদেরউপর শান্তি বর্ষিত হউক”।
দ্বিতীয় আংটিতে লিখা থাকিবে-
“শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে বেহেশতে প্রবেশ কর”।
তৃতীয় আংটিতে লিখা থাকিবে-
“এই জান্নাত তোমাদের কৃত আমলের বিনিময় স্বরূপ প্রদান করা হইল”।
চতুর্থটিতে লিখা থাকিবে-
“তোমাদের থেকে চিন্তা ভাবনা দূর করিয়া দেওয়া হইয়াছে”।
পঞ্চমটিতে লিখা থাকিবে-
“আমি তোমাদিগকে পোষাক ও অলংকার পরিধান করাইয়াছি”।
ষষ্ঠটিতে লিখা থাকিবে-
“আমি তোমাদিগকে ডাগর চোখা হুরের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করিয়াছি”।
সপ্তমটিতে লিখা থাকিবে-
“সেথায় তোমাদের আকাংক্ষিত সবকিছুই রহিয়াছে। অধিকন্তু রহিয়াছে' তোমাদের নয়নেরপ্রশান্তিদায়ক বস্তু সমূহ আর সেথায় তোমরা অনন্তকাল থাকিবে”।
অষ্টমটিতে লিখা থাকিবে-
“তোমরা নবীগণ ও সিদ্দীকীনদের প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শন করিয়াছিলে”।
নবমটিতে লিখা থাকিবে-
“তোমরা এমন যুবকে পরিণত হইয়াছ যে তোমরা আর বৃদ্ধ হইবে না”।
দশমটিতে লিখা থাকিবে-
“আজ তোমরা এমন লোকের প্রতিবেশী যাহারা স্বীয় প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না”।
বেহেশতে প্রবেশের জন্য পাঁচটি শর্ত —
যে ব্যক্তি উপরোল্লিখিত নিয়ামত সমূহ লাভ করিতে চায় সে ব্যক্তি যেন নিম্নে পাঁচটি বিষয়েরউপর নিয়মিত আমল করে।
(১) সকল প্রকার পাপ কার্য হইতে বিরত থাকা যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ
“যে ব্যক্তি কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ হইতে বিরত থাকিল তাহার ঠিকানা হইবে বেহেশত”।
(২) যৎসামান্য পার্থিব সম্পদের উপর সন্তুষ্ট থাকা।
(৩) নেক কাজে খুব আগ্রহী থাকা কেননা বেহেশত তো আমলের বিনিময়েই মিলিবে,
(৪) আল্লাহর নেককার বান্দাদেরকে মহব্বত করা এবং তাহাদের সাথে সাক্ষাৎ করিতে থাকা।তাহাদের মজলিস সমূহে অংশগ্রহণ করিতে থাকা। কেননা কিয়ামতের দিবসে তাহাদেরসুপারিশ গ্রহণ করা হইবে। হাদীছে আছে উত্তম লোকদের সহিত গভীর ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক স্থাপনকর কেননা কিয়ামতের দিবসে প্রত্যেকে স্বীয় ভ্রাতার জন্য সুপারিশের অধিকারী হইবে।
(৫) (আল্লাহর দরবারে) বেশী বেশী দোয়া করিতে থাকা, বিশেষ করে বেহেশত এবং উত্তমমৃত্যুর জন্য।
হেকমত পূর্ণ উক্তি
(১) পরকালীন প্রতিদান সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও পার্থিব জগতের প্রতি আসক্ত এবংউহার 'উপর নির্ভরতা বোকামী এবং মূর্খতা।
(২) আমল সমূহের প্রতিদান জানা থাকা সত্ত্বেও উহার জন্য চেষ্টা ও পরিশ্রম না করা, ইচ্ছাকৃতঅন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার তুল্য।
(৩) সে ব্যক্তিই বেহেশতের সুখ শান্তির অধিকারী হইবে যে পার্থিব সুখ শান্তিকে বর্জনকরিয়াছে। বেহেশতে মওজুদ সম্পদ ঐ ব্যক্তিই লাভ করিবে যে তুচ্ছ পার্থিবতা পরিত্যাগকরিয়া তুষ্ট রহিয়াছে।
এক ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির ঘটনা—
কোন এক ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি শাক শব্জিতে লবণ মিশ্রিত করিয়া রুটি ব্যতীত আহার করিতেন।জনৈক ব্যক্তি তাহার এইরূপ আমল সম্পর্কে তাচ্ছিল্য মূলক প্রশ্ন করিলে তিনি উত্তর দিলেনযে- পার্থিব জগতকে আমি আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করি, যাহাতে আহার্য বস্তুরদ্বারা শক্তি অর্জিত হয় এবং আল্লাহর ইবাদত করিতে পারি, উহার বিনিময়ে বেহেশত লাভহইবে। আর তুমি তো পার্থিব জগতের মূল্যবান খাদ্য দ্রব্যাদি পায়খানায় পরিণত করারউদ্দেশ্যে আহার কর।
ব্যাখ্যাঃ ইহা তো উল্লিখিত ব্যক্তির ঘটনা। তদনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তির আমল করা সমীচীননহে। কেননা আল্লাহ প্রদত্ত হালাল নিয়ামত সমূহ ব্যবহার করা শুধু বৈধই নহে বরং আল্লাহরকাছে পছন্দনীয়, আল্লাহ পাক যাহাকে নিয়ামত দান করেন তাহার উপর নিয়ামতের প্রভাবদেখিতে পছন্দ করেন-
আল্লাহ পাক বলেনঃ –
“স্বীয় প্রভুর নিয়ামত সমূহকে প্রকাশ কর।
ইবরাহীম বিন আদহাম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ঘটনা—
একবার ইবরাহীম বিন আদহাম রহমতুল্লাহি আলাইহি গোসলখানায় যাইবার ইচ্ছাকরিলেন। তখন গোসলখানার মালিক তাহাকে এই বলিয়া ফিরাইয়া দিলেন যে, ভাড়াব্যতীত প্রবেশ করিতে পারিবেন না। এই কথা শোনা মাত্রই তিনি কাঁদিতে কাঁদিতে বলিতেলাগিলেন, হে আল্লাহ! শয়তানের ঘরে ভাড়া ব্যতীত প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা হইতেছেনাআর বেহেশত তো আম্বিয়া এবং সিদ্দীকগণের ঘর সেখানে ভাড়া ব্যতীত কিভাবে প্রবেশেরঅনুমতি থাকিবে। (অর্থাৎ আমল ব্যতীত কিভাবে প্রবেশের অনুমতি মিলিবে?)।
একটি সুক্ষ্ম বিষয়—
আল্লাহ পাক জনৈক নবীর প্রতি ওহী প্রেরণ করিলেন যে, হে আদম সন্তান! তোমরা তোঅধিক মূল্যে দোযখ ক্রয় করিতেছ, অথচ অল্প মূল্যে বেহেশত ক্রয় করিতেছ না”। এই বাণীরব্যাখ্যা এইরূপ করা হইয়াছে যে, এক ফাসেক বক্তি স্বীয় নাম ধামের জন্য ফাসেকদেরকেনিমন্ত্রণ করে হাজার হাজার টাকা খরচ করা সাধারণ ব্যাপার মনে করে এবং উহার বিনিময়েদোযখ ক্রয় করে। আল্লাহর উদ্দেশ্যে দরিদ্র ও ক্ষুধার্তকে নিমন্ত্রণ পূর্বক চার আনা খরচ করাতাহার জন্য কঠিন বলিয়া মনে হয় অথচ ইহাই ছিল বেহেশতের মূল্য
আবু হাযিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর উক্তি—
আবু হাযিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন- যদি সমস্ত হৃদয়গ্রাহী বিষয়কে বর্জন করিয়াওবেহেশত লাভ হয়, তাহাও অতি সস্তা দ্রব্য। অনুরূপভাবে সমস্ত দুঃখ কষ্ট স্বীকার করিয়াও যদিদোযখ হইতে মুক্তি লাভ হয় তাহাও অতি সস্তা। অথচ আল্লাহর উদ্দেশ্যে সহস্র হৃদয়গ্রাহীবিষয় থেকে যে কোন একটিকে বর্জন করিলেও বেহেশত লাভ হইবে এবং সহস্র দুঃখ কষ্ট হইতেযে কোন একটি সহ্য করিলেও দোযখ হইতে মুক্তি মিলিবে আর ইহা কতই না সস্তা?
বেহেশতের বিনিময় —
হযরত ইয়াহ্ইয়া বিন মুয়ায রাযি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পার্থিবতা বর্জন করা তোকঠিন ব্যাপার। কিন্তু বেহেশত বর্জন ইহা অপেক্ষা আরও অধিক কঠিন। আর পার্থিবতাবর্জন করাই বেহেশতের বিনিময়।
বেহেশত এবং দোযখের সুপারিশ—
হযরত আনাস বিন মালেক রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, যদি কোন ব্যক্তি তিনবার বেহেশততালাশ করে তাহা হইলে বেহেশত আল্লাহর দরবারে আবেদন করে যে, হে আল্লাহ! তাহাকেবেহেশতে প্রবিষ্ট করিয়া দিন। আর যদি কোন ব্যক্তি তিন বার দোযখ হইতে রেহাই চায়, তাহাহইলে দোযখ আল্লাহর দরবারে আবেদন করে যে, হে আল্লাহ! তাহাকে দোযখ হইতে রেহাইদান করুন।
“হে আল্লাহ! আমাদিগকে বেহেশত দান করুন”!!
اللَّهُمَّ أَجِرْنَا مِنَ النَّارِ اللَّهُمَّ أَجِرْنَا مِنَ النَّارِ اللَّهُمَّ أَجِرْنَا مِنَ النَّارِ
(আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার)-তিনবার
“হে আল্লাহ! আমাদিগকে দোযখ হইতে রেহাই প্রদান করুন”!!
বেহেশতে বন্ধুবান্ধবের সাক্ষাৎ কি সাধারণ অনুগ্রহ? ইহার পরে আবার রহিয়াছে অগণিত ওঅফুরন্ত নিয়ামতের সমারোহ।
বেহেশতের বাজার—
রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ বেহেশতে বাজার থাকিবে।কিন্তু সেথায় ক্রয় বিক্রয় হইবে না। বরং বন্ধু বান্ধবগণ বৃত্তাকারে উপবেশন করিবে এবংপার্থিব জগত সম্পৰ্কীয় আলাপ আলোচনা করিতে থাকিবে যে, জাগতিক জীবনে কিভাবেআল্লাহর ইবাদত করিয়াছিল। পার্থিব জগতে দরিদ্র এবং সম্পদশালীর অবস্থা কি ছিল। মৃত্যুকিভাবে আগমন করিয়াছিল এবং কত দুঃখ কষ্ট সহ্য করিয়া বেহেশতে পৌছিয়াছে। বেহেশতলাভের জন্য কেউ প্রস্তুত রহিয়াছে কি? বেহেশতের হাকিকত, উহার নিয়ামত সমূহ এবংবিভিন্ন অবস্থা আপনি অধ্যয়ন করিয়াছেন, সুতরাং বেহেশতে প্রবেশ করার জন্য বোধ হয়অবশ্যই আপনার মন চাহিতেছে এবং সে উদ্দেশ্যে হয়তো বা আল্লাহর দরবারে প্রার্থনাওকরিতেছেন। নিঃসন্দেহে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য বেহেশতের আকাংক্ষা থাকা চাই। কিন্তুঈমান এবং নেক আমল ব্যতিরেকে বেহেশত লাভের ইচ্ছা পোষণ করা এবং শুধুমাত্র দোয়াকরিয়াই ক্ষান্ত থাকা নিজেকে ধোকা দেওয়ার নামান্তর। সে ব্যক্তি মুর্খ যে বেহেশতেরআকাংক্ষা তো করে কিন্তু গোনাহে লিপ্ত থাকিয়া নেক আমলের পুজি সংগ্রহের ব্যাপারেগাফেল থাকে। মুয়াযযিন আল্লাহর দিকে আহবান করার পরও সে আরামে শুইয়া থাকে।ব্যবসায় লিপ্ত থাকিয়া ওয়াক্তের পর ওয়াক্ত নামায নষ্ট করিতেছে। যাকাত আদায় করারসময় হইলে মালের মহব্বতে প্রাণ বায়ু উড়িয়া যাইতে চায়। রমযান মাস উপস্থিত হইলে রোযারাখার খবরও থাকে না। হজ্জ ফরজ হইলে সম্পদের মহব্বতে হজ্জ না করিয়াই মরিয়া যায়।ব্যবসায় হালাল হারামের প্রতি বিন্দুমাত্রও লক্ষ্য রাখেনা। অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করাকেবাহাদুরী মনে করে। কুরআন হাদীস শিক্ষা করা এবং শিক্ষা প্রদানকে হীন কাজ বলিয়া মনেকরে। দুর্বলদের উপর জুলুম অত্যচার অবিচার করে, দরিদ্রকে কষ্ট দেয়, আর বলপূর্বকপারিশ্রমিক বিহীন কাজ করাইয়া নেয়। ঘুষ দেওয়া নেওয়া ভাল কাজ বলিয়া মনে করে, এতিমদের সম্পদ আত্মসাৎ করে। বিধবাদের দুর্বলতা ও অসহায় অবস্থা হইতে ফায়দা লুটে।একে অন্যের অধিকার গ্রাস করিয়া লয়। নফল ইবাদতের ভয়ে পালাইতে থাকে। আল্লাহরজিকির হইতে দূরে থাকে। এতদ্বসত্বেও শুধুমাত্র বেহেশতই নহে বরং বেহেশতের উচ্চ মর্যাদারআকাংক্ষা করা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কি হইতে পারে?
যদি বেহেশতে যাইতে হয় তাহা হইলে পূর্ণ জীবনই আল্লাহর এবং রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহুআলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)- এর নির্দেশানুযায়ী জীবন-যাপন করিতে হইবে।কুপ্রবৃত্তিকে দমন করিতে হইবে।
এক কবি বলিয়াছেন-সর্বদা গাফেল থাকা তোমার বৈশিষ্ট্য নহে। মনে রাখিও বেহেশত এতসস্তা নহে। দুনিয়া তো পথিকের চলার পথ মাত্র। ইহা অবস্থানের স্থান নহে। আরাম আয়েশআর যেমন খুশী জিন্দেগী চালাইবার স্থান নহে।
পরবর্তী পর্ব-
আল্লাহর রহমত
Comments
Post a Comment