আমরা সে জাতি (২) তাওহীদের মহাবাণী গোপন রাখতে পারবো না



📚আমরা সেই সে জাতি - ‍২

'তাওহীদের মহাবাণী গোপন রাখতে পারবো না'—
হযরত আবুযার (র.) আরবের গিফার গোত্রের লোক। মক্কা থেকে অনেক দূরে বাস করেন তিনি। সত্যানুসন্ধি আবুযার (র.) শুনলেন মক্কায় একজন নবী আবির্ভূত হয়েছেন। আবুযার মক্কায় গিয়ে তাঁর সাক্ষাত লাভের মনস্থ করলেন। কিন্তু কুরাইশদের শ্যেন দৃষ্টির সামনে তাঁকে খুঁজে বের করে সাক্ষাত করা নিরাপদ নয়। তবু আবুযার মক্কায় চললেন। সত্যসন্ধানী আবুযারকে সত্য প্রচারকের সাক্ষাত যে পেতেই হবে। 

মক্কায় গিয়ে তিনদিন মৌন অনুসন্ধানের পর আবুযার মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার সাক্ষাত লাভের সৌভাগ্য অর্জন করলেন। নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর সাক্ষাত পেয়েই সত্যের জন্য পাগল পারা আবুযার (র.) ইসলাম গ্রহণ করলেন। 

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আবুযারকে উপদেশ দিলেন, “ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রেখে তুমি নীরবে দেশে ফিরেযাও।”
ইসলাম গ্রহণ করে আবুযার (র.) কিন্তু আর স্থির থাকতে পারলেন না। যে সত্য গ্রহণের জন্য এতদিন তিনি পাগল প্রায় ছিলেন, সে সত্য প্রচারের জন্য এখন তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন।তাঁর মনে কাঁটার মতো বিঁধতে লাগলো। ফুল শয্যায় শয়ন করে কাল কাটাবার জন্য আবুযারইসলাম গ্রহণ করেন নি কিংবা নিরাপদে মুসলিম হয়ে থাকার বাহবাও তো আবুযারের জন্য নয়। তাহলে আবুযার চুপ করে থাকবে কেন? এই চিন্তা আবুযারকে চুপ থাকতে দিল না, স্থির হতে দিল না। 

হযরত আবুযার (র.) বিনীতভাবে মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে নিবেদন করলেন, “তাওহীদের মহাবাণী আমি গোপন রাখতে পারবো না, কাফিরদের মধ্যে গিয়ে চেঁচিয়ে তা ঘোষণা করবো।”

যে আবুযার কাফিরদের ভয়ে মক্কায় মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নাম পর্যন্ত নিতে সাহস করেন নি, সকলের চোখ এড়িয়ে গোপনে তিনদিন ধরে যে আবুযার মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে খুঁজে ফিরেছেন কালেমা তাওহীদ উচ্চারণের পর সেই আবুযার সমস্ত ভয়-ভীতি, অত্যাচার এমন কি মৃত্যু ভয়ের আশঙ্কাকেও জয় করে নিলেন। কিছুই আর তাঁকে পিছনে টানতে পারলো না। মহানবী(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছ থেকে হযরত আবুযার (র.) ছুটে এলেন কাবার চত্বরে।সেখানে অনেক কুরাইশ জটলা পাকিয়ে বসেছিলো। আবুযার কাবাগৃহের সামনে গিয়ে বজ্র নির্ঘোষে ঘোষণা করলেন, “আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। মুহাম্মাদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর রাসূল।

হযরত আবুযারের তাওহীদি ঘোষণা বোধ হয় কুরাইশদের হৃদয়ে তীরের মত বিদ্ধ হয়েছিলো।তারা আহত হিংস্র পশুর মত ছুটে এলো আবুযারকে লক্ষ্য করে। সবাই মিলে চারদিক থেকে নির্মম প্রহার শুরু করলো তাঁর উপর। আঘাতে আঘাতে আবুযার (র.) এর দেহ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল। রক্তে ভিজে গেল কাপড়-চোপড়। ঢলে পড়লেন মাটিতে। তিনি মুমূর্ষ।
সেখানে হযরত আব্বাস উপস্থিত ছিলেন। তিনি তখনও মুসলিম না হলেও ভ্রাতুষ্পুত্রমুহাম্মাদকে (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অত্যন্ত ভালবাসতেন। তিনি মুমূর্ষ আবুযারের দেহকে নিজের দেহ দিয়ে আড়াল করে উন্মাদ প্রায় কুরাইশদের বলতে লাগলেন, “কি সর্বনাশ! এ যে গিফার গোত্রের লোক। সিরিয়া যাবার পথেই এদের নিবাস। এর এভাবে মৃত্যু হলে সিরিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য করার পথই যে আমাদের বন্ধ হয়ে যাবে।” একথা শুনে কুরাইশদের সম্বিত ফিরে এলো। তাদের মনে হলো, আব্বাস তো ঠিক কথাই বলেছেন। তারা আবুযারকে ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ালো।

এ অমানুষিক নিপীড়ন হযরত আবুযারকে সত্যের প্রচার থেকে বিরত রাখতে পারে নি। এই ঘটনার পরও তিনি পর পর দু'দিন কাবার চত্বরে গিয়ে উচ্চ কণ্ঠে তাওহীদের বাণী ঘোষণা করেছেন। অত্যাচার-নিপীড়নেরও পুনরাবৃত্তি হয়েছে। কিন্তু আবুযার সত্যের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সব কিছুকেই মেনে নিয়েছেন হাসি মুখে। অদ্ভুত শক্তি তাওহীদের। মনে-প্রাণে একবার এ কলেমা পাঠ করলে মানুষের মনে যে শক্তির বন্যা আসে, তার সামনে থেকে জগতের সব অত্যাচার, সব যুগ্ম আর তার ভয় তৃণ খণ্ডের মতো ভেসে যায়।
---------------------------



Comments

Popular posts from this blog

কারামত - (আনা সাগরের পানি ছোট্ট পাত্রে চলে আসার রহস্য)

প্রকৃত সাধক তার উপযুক্ত মুরীদকেই সাজ্জাদানশীল করেন

মে’'রাজ (পর্ব- ১)