আমরা সে জাতি (২০) জিরানা শিবিরের বন্দী মুক্তি

আমরা সেই সে জাতি - ‍২০

জিরানা শিবিরের বন্দী মুক্তি—
তায়েফের সন্নিকটবর্তী জিরানা লোকালয়। হুনাইন যুদ্ধের ছ'হাজার বন্দী এখনও জিরানার মুসলিম শিবিরে বন্দী। তায়েফের অবরোধ শেষ করে মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ফিরে এলেন জিরানার শিবিরে।

জিরানায় যারা বন্দী ছিল সবাই হাওয়াযেন গোত্রের লোক। হাওয়াযেন গোত্রের একটি শাখা বনু সা'দ। এই বনু সা'দ মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দুধমাতা হালিমা (র.)-এর কবিলা। এদের সাথেই হেসে-খেলে মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর শিশুকালের ৫টি বছর কেটেছে। বনু সা'দ কবিলার লোকেরাও হাওয়াযিনদের সাথে বন্দী ছিল জিরানায়।

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জিরানায় ফিরে এলে হাওয়াযেনদের একটি সম্মানিত প্রতিনিধিদল মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে এসে দেখা করলেন। 
প্রতিনিধি দলের নেতা যুহাইর ইবন সা'দ মহানবীর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কাছে এসে আরজ করলেন, "যারা বন্দী শিবিরে অবস্থান করছে, তাদের মধ্যে আপনার ফুফু ও খালারাও রয়েছেন। খোদার কসম, যদি আরবের সুলতানদের মধ্য থেকে কেউ আমাদের বংশের কারো দুধ পান করতেন, তাহলে তাঁর কাছে আমাদের অনেক আকাংখা আবদার থাকতো। আর আপনার কাছ থেকে আমরা আরও বেশী আশা রাখি।”

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সাগ্রহে তাদের কথা শুনলেন। বোধ হয় তাঁর মন ছুটে গেল সুদূর অতীতের এক দৃশ্যে। ভেসে উঠল তাঁর চোখে, হাওয়াযেনদের উপত্যকা ও প্রান্তর ভূমি। ফুফু-খালা যারা বন্দী তাঁদের স্নেহ তাঁকে কতইনা শান্তির স্নিগ্ধ পরশ বুলিয়েছে। 

কিন্তু তিনি তো কোন রাজা নন, কিংবা নন কোন ডিক্টেটর অথবা স্বেচ্ছাচারী সম্রাট। সব মুসলমানের স্বার্থ ও মতামত যে বন্দীমুক্তির সাথে জড়িত, সে বন্দীদের তো তিনি তাঁর একার ইচ্ছায় ছেড়ে দিতে পারেন না। এ অধিকার সকলের, তাই সকলের সামনেই এটা পেশ করা দরকার। 

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) শান্ত স্নিগ্ধ কন্ঠে বললেন, - "যুহাইর! যুদ্ধ বন্দীদের উপর আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের অধিকার যতটুকু, তা আমি এই মুহূর্তে ত্যাগ করছি। আর অন্যান্য সকল যুদ্ধ বন্দীর মুক্তির জন্য যোহরের নামাযের পর সমবেত মুসলমানদের কাছে আবেদন কর।”

সে দিনই যোহরের নামাযের পর হাওয়াযেনদের প্রতিনিধি দলটি এসে মুসলমানদের সামনে দাঁড়াল। আবেদন জানাল তারা বন্দীদের মুক্তির জন্য আগের মত করেই। 

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ঠিক আগের মত বললেন, "আমি আমার কবিলার লোকদের অধিকার রাখি, আমি তাদের দাবী পরিত্যাগ করছি। আর মুসলমানদের সকলের কাছে সমস্ত বন্দীর মুক্তির জন্য সুফারিশ করছি।” 

সমবেত আনসার ও মুহাজির সবাই এক বাক্যে বলে উঠল, "আপনার কবিলার মত আমাদের অধিকারও আপনার উপর অর্পিত হলো।” এর পর মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ছ'হাজার বন্দীর সকলকেই মুক্তি দিলেন। 

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইচ্ছা করলে সব বন্দীকে আগেই নিজের ইচ্ছায় মুক্তি দিতে পারতেন। কেউ-ই প্রতিবাদ করতোনা। কিংবা অসন্তুষ্টও হতো না কেউ। কিন্তু সব যুগের সব মানুষের আদর্শ মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তা করেননি। মুসলমানদের শাসক, অধিনায়ক যাঁরা তাঁরা মুসলমানদেরই একজন হবেন, তাঁর অধিকারের সীমাও সকলের চেয়ে বেশী কিছু হবে না, এ উজ্জল শিক্ষাই চিরন্তন করে রাখলেন তিনি পৃথিবীতে।
----------

Comments

Popular posts from this blog

কারামত - (আনা সাগরের পানি ছোট্ট পাত্রে চলে আসার রহস্য)

প্রকৃত সাধক তার উপযুক্ত মুরীদকেই সাজ্জাদানশীল করেন

মে’'রাজ (পর্ব- ১)