সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের ফজিলত
🌸 সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের ফজিলত
✍🏻 ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 📘 আত্মার আলোকমণি থেকে
ভূমিকা
মানুষের সমাজজীবন টিকে আছে পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়নীতি ও আল্লাহভীতি উপর ভিত্তি করে। ইসলাম মানুষকে শুধু নিজে সৎ হওয়ার নয়, বরং সমাজে সৎকাজ প্রতিষ্ঠা ও অসৎকাজ রোধের দায়িত্বও দিয়েছে। এই দায়িত্ব পালন করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য ঈমানের অপরিহার্য অংশ। কোরআনে বলা হয়েছে—
"তোমরা ন্যায়ের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজে আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে।" (সূরা আলে ইমরান : ১০৪)
এই নির্দেশ শুধু উপদেশ নয়, বরং এটি ইসলামের সামাজিক নীতিমালার মূলভিত্তি। সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ এমন এক আমল, যার মাধ্যমে সমাজে ন্যায়, দয়া ও আল্লাহভীতি প্রতিষ্ঠা পায়।
প্রথম পর্ব
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় কাজ দেখবে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে; যদি তাতে অক্ষম হয়, তবে জিহ্বা দিয়ে বলবে; আর তাও যদি না পারে, তবে অন্তরে তা ঘৃণা করবে, আর এটিই হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতম স্তর।” (সহীহ মুসলিম)
এই হাদীসের মাধ্যমে বোঝা যায়, একজন মুসলমান কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে পারে না। সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা মানে হলো সমাজে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা। এটি ঈমানের পরিপূর্ণতার প্রতীক।
দ্বিতীয় পর্ব
হযরত আবু যর গিফারী (র.) বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (র.) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট জানতে চাইলেন— “হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যেমন জিহাদ, তেমনি আর কোনো প্রকার জিহাদ কি আছে?”
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উত্তরে বললেন, “হে আবু বকর! আল্লাহর যমীনে এমন কিছু জিহাদকারী আছে, যারা শহীদদের চেয়েও উত্তম। তারা হচ্ছে সেইসব মানুষ, যারা সৎকাজে আদেশ দেয়, অসৎকাজে নিষেধ করে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসে এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই শত্রুতা পোষণ করে।”
পরবর্তীতে তিনি বলেন, “আখেরাতে এমন কিছু মানুষ থাকবে, যারা শহীদদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদায় অবস্থান করবে। তাদের জন্য জান্নাতে ইয়াকুত ও জমরদ খচিত তিনশত দরজাবিশিষ্ট সুসজ্জিত প্রাসাদ থাকবে, এবং তিন লক্ষ বেহেশতী হুর তাদের সঙ্গিনী হবে। তারা সবাই বলবে— ‘আপনি অমুক দিনে সৎকাজে আদেশ করেছিলেন ও অসৎ কাজে নিষেধ করেছিলেন।’”
এতে স্পষ্ট যে, সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা ও মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখা আল্লাহর কাছে এক বিশাল আমল, যা শহীদের মর্যাদার চেয়েও উন্নত হতে পারে।
তৃতীয় পর্ব
এক রেওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা‘আলা হযরত মূসা (আ.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মূসা! তুমি কি আমার জন্য কোনো আমল করেছো?”
হযরত মূসা (আ.) বললেন, “হে আল্লাহ! আমি আপনার জন্য নামায পড়েছি, রোযা রেখেছি, সিজদা করেছি, প্রশংসা করেছি, কিতাব তিলাওয়াত করেছি ও যিকর করেছি।”
আল্লাহ বললেন, “হে মূসা! নামায তোমার জন্য দলীল, রোযা জান্নাতের কারণ, দান তোমার জন্য ছায়া, তসবীহ জান্নাতে বৃক্ষ, কিতাব তিলাওয়াত হুর ও প্রাসাদের উপহার, আর যিকর তোমার নূর; কিন্তু খালেস আমার জন্য তুমি কি করেছো?”
হযরত মূসা (আ.) বললেন, “হে পরওয়ারদিগার! এমন একটি আমলের কথা বলুন, যা আমি খালেসভাবে আপনার জন্য করতে পারি।”
আল্লাহ বললেন, “হে মূসা! তুমি কি আমার খাতিরে আমার কোনো ওলীকে ভালোবেসেছো, অথবা আমার জন্য কারও প্রতি শত্রুতা পোষণ করেছো?”
এরপর হযরত মূসা (আ.) বুঝলেন যে, আল্লাহর ভালোবাসায় কাউকে ভালোবাসা এবং তাঁর জন্যই কারও প্রতি বিরূপ হওয়াই সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ আমল।
চতুর্থ পর্ব
হযরত আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (র.) বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট জিজ্ঞেস করেন, “সর্বশ্রেষ্ঠ শহীদ কে?”
নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তি অত্যাচারী শাসককে সৎকাজে উপদেশ দেয় ও অসৎ কাজে নিষেধ করে, তারপর সেই শাসক তাকে হত্যা করে ফেলে। যদি হত্যা না-ও করে, তবুও সে দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যায় যতদিন দুনিয়ায় বেঁচে থাকে।”
হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন, নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও ইরশাদ করেছেন, “আমার উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সে, যে জালেম বাদশাহর সামনে সত্য কথা বলে, সৎকাজে উৎসাহিত করে ও অসৎ কাজে নিষেধ করে; এবং যদি সেই বাদশাহ তাকে হত্যা করে ফেলে, তবে তার স্থান জান্নাতে হবে হযরত হামযাহ (র.) ও হযরত জা‘ফর (র.)-এর মাঝে।”
এই শিক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায়, সত্যের পক্ষে কথা বলা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শুধু নৈতিক সাহস নয়, বরং এটি ঈমানের পরিপূর্ণতার প্রকাশ।
উপসংহার
সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ ইসলামের মূল আত্মা। এটি সমাজকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করে এবং অন্যায়, দুর্নীতি ও অশান্তি থেকে রক্ষা করে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, সে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করে।
অতএব, মুমিন হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো— নিজেকে সৎকাজে অভ্যস্ত করা, অন্যদের তাতে আহ্বান জানানো এবং অন্যায় ও পাপাচার থেকে দূরে রাখা। কারণ আল্লাহ বলেন,
"তোমরা ন্যায় ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য করো; আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সাহায্য করো না।" (সূরা মায়িদা : ২)
🌿 দোয়া
اللهم اجعلنا من الذين يقولون الحق ولا يخافون في الله لومة لائم
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাজ‘আলনা মিনাল্লাযীনা ইয়াকুলুনাল হাক্কা ওয়ালা ইয়াখাফূনা ফিল্লাহি লাওমাতা লা’ইম।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদেরকে সেইসব মানুষের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা সত্য কথা বলে এবং আল্লাহর পথে কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করে না।
------------------------
#সৎকাজ #নেককাজ #অসৎকাজে_নিষেধ #ঈমান #রসূলুল্লাহ #আল্লাহ #কুরআন #উম্মতে_মুহাম্মাদী #নৈতিকতা #মানবকল্যাণ #ইবাদত #দরূদ #হাদীস #মুমিন #সদকাহ #জিহাদ #নেকউপদেশ #সত্যকথা
Comments
Post a Comment